স্বাগতম


Saturday, February 11, 2012

Friday, November 11, 2011

এলেবেলে-৩

ইদানিং টের পাচ্ছি মন খারাপ হওয়ার হার বেড়ে গেছে; হয়ত খুব সামান্য কারনেই কখনো মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে নিজেকে যত শক্ত ভাবতাম তত শক্ত মানুষ আসলে আমি না! যখন এটা বুঝতে পারি নিজেকে অসহায় লাগে! কারণ যে বিষয়গুলো নিয়ে এমন অনুভূতি হয়, কখনো বা এমনকি ভিতর থেকে কান্না উঠে আসতে চায়- সেসব বিষয়ে আসলে কিছু করার পাইনা; অসহায় অক্ষমের মত উদ্গত কান্না সামলে আবার কাজে মন দেয়ার চেষ্টা করা ছাড়া!

যেমন আজকের কথা। ল্যাবে এসে সচলে ঢুকে দেখি নতুন ব্যানারটা জাফলং নিয়ে করা। দেখেই মাথার মধ্যে একে একে ভীড় করে আসা শুরু করল কয়েক বছর আগের সিলেট ট্যুরের স্মৃতি- কত কত স্মৃতি, কত কত ঘটনা! একসঙ্গে হই হুল্লোর করে কী মজাটাই না হয়েছিলো! আর এখন?

কেউ দেশে, কেউ বিদেশে, কেউ চাকরী করছে, কেউ বা নিজের ব্যবসা। সবাই মিলে সেভাবে হইহুল্লোর করা হয় না কত দিন!... মনেও করতে পারি না এখন! আমরা যারা একসঙ্গে আছি এদিকে, তাদের তবু মাঝে মাঝে কথা বার্তা হয়, হয়ত বা দেখাও হওয়ার সুযোগ থাকে; অন্যদের সঙ্গে তো কালে ভদ্রেও কথা হয় না বলতে গেলে, দেখা তো সুদূর বহুদূর। বুক চিড়ে আসা দীর্ঘশ্বাস টা হজম করা ছাড়া আর তেমন কিছু করার থাকে না!

কবে যে ফিরতে পারবো দেশে, তার কোন ঠিক নেই; বা আদৌ আর ফেরা হবে কিনা দেশে সেই বা কে জানে! আবার ইতিমধ্যে জুনিওরদেরও কেউ কেউ হয়ত পাড়ি জমাবে বিদেশে। শেষ পর্যন্ত সেই সিলেট-জাফলং ট্যুর গ্রুপের কেউ কি অবশিষ্ট রবে দেশে- হয়ত দুয়েকজন ছাড়া!

কিন্তু আর কি কখনও সেভাবে একসঙ্গে আড্ডা দেয়া যাবে, একসঙ্গে ঘোরাঘুরি করার সুযোগ হবে! হায়, এখানে এই বিদেশ বিঁভুইয়ে মাঝে মাঝে বড্ড মন আনচান করে সবাই মিলে মন খুলে একটুখানি গল্পগুজব করার জন্যে...সেই আগের মত সময়কে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে; সেই আগের মত উচ্ছ্বলতায়!

Monday, August 15, 2011

স্মৃতিতে আমি-৩

[এই সিরিজটি মূলত আমার নিজেকে নিয়ে লেখা বিভিন্ন সময়ের খন্ড খন্ড কিছু আলগা ছবি- যেগুলো হয়ত এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায় নি, কিন্তু স্মৃতির গভীরে ঝাপসা হয়ে যেতে বসেছে, মাঝে মাঝে আনন্দ/বেদনাময় দূর্বল কোন মুহুর্তে উঁকি দেয়, সেগুলো ধরে রাখার একটি অপচেষ্টা কেবল এই সিরিজ এবং সঙ্গত কারনেই কোন প্রকার সময়ক্রম বজায় রাখা যায়নি এতে]
------------------------------------------------------------------------



আমার নানাবাড়ি রায়গঞ্জ, নাগেশ্বরী থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে। জন্মের পর থেকে সেখানেই ছিলাম আমরা রায়গঞ্জ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমার পড়াশোনার শুরু ক্লাস থ্রী তে ওঠা পর্যন্ত সেখানে পড়ি থ্রী তে কিছুদিন ক্লাস করেছি; এরপর নাগেশ্বরীতে আমাদের বাড়িতে চলে আসি ইতোমধ্যে বাসার কাজ মোটামুটি শেষ করে থাকার মত করা হয়েছে যাই হোক, নাগেশ্বরীতে ২ নং প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি হলাম এসে থ্রী তে; মনে আছে ভর্তি রোল ছিল ৪৭

রায়গঞ্জে থাকাকালীন একটা ঘটনা মনে পড়ে কোন কোন স্যারের মতে আমার হাতের লেখা নাকি ভালো কিংবা তুলনামূলক ভালো ছিলো! ক্লাসের মধ্যে বোর্ডে প্রশ্ন বা নোটিস টাইপ কোন কিছু লিখবার দরকার হলে ডাক পড়ত আমার! এটা হত প্রধানত একজন নির্দিষ্ট স্যার এর ক্লাসে, ওনার নামটা মনে পড়ছে না। হয়ত উনি আমাকে বেশি পছন্দ করতেন বলে এরকম করতেন। [ শৈশবের সেই সময়ের স্যারদের কারো নাম মনে করতে পারছিনা এই মুহূর্তে, এ লজ্জা রাখি কোথায়! :( ]

আর একটা ঘটনা মনে পড়ে মাঝে মাঝে, ক্লাস থ্রী কিংবা ফোর এরযতটুকু মনে হয় নাগেশ্বরীতে এসে ভর্তি হওয়ার প্রথম বছরের ঘটনা; সে হিসেবে থ্রী'ই হবেকোন কারণে একদিন মার্জুনা আপার ক্লাস করিনি। এর পর দিন কিছুটা ভয়ে ভয়ে আর গেলাম না ক্লাসে। সকালে বাসা থেকে বের হলাম ঠিকই, কিন্তু স্কুল এলাকায় এসে আর স্কুলে না গিয়ে এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ালাম। ছুটির সময় হলে সুবোধ বালকের মত বাড়ি ফিরে গেলাম। কেউ কিছু টের পেল না। তৃতীয়দিন স্বাভাবিকভাবেই ভয় আরো বাড়লো! দুই দিন যাইনি, আজকে তো যাওয়াই যাবে না! সেদিনও হল আগের দিনের পুনারাবৃত্তি। এরপর চতুর্থ, পঞ্চম, ছষ্ঠ...কোনদিনই ভয় কাটিয়ে উঠতে পারিনি। এভাবে টানা একমাস বাইরে বাইরে কাটালাম। স্কুল এর সামনে একটা স্টুডিও ছিলো, একটা বেশ ভালো অংশ সময় কাটতো সেখানে বসে, লোকজন আর ছবি দেখে। ওখানে এবং আরো বিভিন্ন দোকানে ব্যাগ রেখে আশেপাশে হাটাহাটি, ঘোরাঘুরি করতাম। স্কুলের সামনের এরিয়াতেই বেশিরভাগ সময় থাকতাম। তবে তার সমস্যাও ছিলো। স্যাররা চা-পান খেতে বাইরে বের হতেন। সেদিকে একটা সজাগ দৃষ্টি রাখতে হত! এভাবে দোকানে ব্যাগ রেখে ঘোরাঘুরি করতে করতে একদিন ব্যাগটা হারালাম! সেদিন ব্যাগ সেই স্টুডিওর টেবিলে রেখে চেয়ারে বসে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম; ঘুম ভাঙ্গার পর দেখি ব্যাগ উধাও। বাসায় গিয়ে শেষে চাপাবাজি করে আর একসেট বই, ব্যাগ এর ব্যবস্থা করতে হল! তখন পর্যন্ত কেউ কিছুই জানে না। বন্ধু বান্ধব, টিচার কোন সূত্রেই বাসায় কোন খোঁজ আসেনি এই এক মাসে। পরে চিন্তা করে কারন মনে হয়েছে যে; স্কুলে নতুন ছিলাম, ভর্তি হয়েছি মোটে কয়েক মাস, খোঁজ খবর হবার মত কোন পর্যায়ে ছিলাম না আসলে- না ক্লাসমেটদের কাছে, না টিচারদের কাছে। এদিকে বার্ষিক পরীক্ষা এসে গেছে। পরীক্ষা তো দিতে যেতে হবে! ছোট মামা তখন আমাদের বাসায় থেকে পড়ে, ক্লাস সেভেন এ; নাগেশ্বরী ডি এম একাডেমী তে। পরবর্তীতে আমিও এই হাইস্কুলেই পড়েছি। যাহোক, ও আমাকে নিয়ে গেলো স্কুলে। পরীক্ষার হলে গিয়ে মামা অভিভাবক সুলভ একটু খবরাখবর নেয়ার চেষ্টা করলো স্যার ম্যাডামদের সাথে কথা বলে! তখনই বোমা টা ফাটল। মার্জুনা আপা, জাহানারা আপা বলে উঠলেন, আরে ও তো গত এক মাস ক্লাসে আসেনি! কী হয়েছিলো!! এরপর আর কিছু তেমন মনে নেই। ঠিকমত পরীক্ষা দিলাম। বাচ্চা বলে হয়তো বাসায়ও আর কিছু বলে নি! ফোরে উঠলাম রোল ১১ করে। বলাই বাহুল্য, এরকম পালিয়ে বেড়ানোর ঘটনা আর ঘটেনি।


২।
ছোটবেলায় নাগেশ্বরীতে একদিন আব্বার সঙ্গে আছি; একটা নতুন অভিজ্ঞতা হল। এক লোক আব্বার সঙ্গে কথা বলছে, দেখি তাকে স্যার বলে ডাকছে! এই ঘটনার পর জেনেছি আব্বা কর্মজীবনের শুরুতে কিছুদিন রায়গঞ্জ উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন এর পরে ওকালতি পেশায় জড়ান নিজেকে ওই ভদ্রোলোক ছিলেন আব্বার সেই সময়ের ছাত্র।

সম্ভবত এলএলবি'র পর প্রাকটিস শুরু করার আগে মাঝখানের সময়টুকু তিনি শিক্ষকতায় ছিলেন আমি অবশ্য মাষ্টার বাবাকে পাইনি, এসব বুঝজ্ঞান হওয়ার পর থেকে এডভোকেট ফাদারকেই দেখেছি
আর সেই সঙ্গে মা'কে দেখেছি চাকরী করতে, নাগেশ্বরী হাসপাতালে। তখন তো বুঝতাম না। পরে জেনেছি, আমার একদম ছোটবেলাটায় আম্মা ছিলেন ফ্যামিলি প্লানিং এ, পরে চলে আসেন হেলথ সেকশনে।


৩।
তখনো আমরা রায়গঞ্জে। একবার আম্মা ট্রেনিং এ গেছে কুড়িগ্রাম। দিনভর ট্রেনিং। এসবই আমি পরে জেনেছি, আমি জানতাম প্রতিদিনকার মত আম্মা অফিসে গেছে। সন্ধ্যা পার হওয়ার পর দেখা গেলো আম্মা আসে না। এবং জানলাম রাতে আম্মা নাও ফিরতে পারেন! কিন্তু ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে আমার কান্না। আর থামায় কে! আমি নাকি এমন ছিলাম যে, সারাদিন একা একা বা নানী, খালাদের সাথে থাকতে পারতাম; কোন সমস্যা ছিলো না। কিন্তু রাত হলেই আম্মাকে লাগতো! তখন আর কারো কোলে বা কথায় কাজ হত না। সেদিন আব্বাকে সারারাত ঘুমাতে দেই নি! অনেক রাত পর্যন্ত কান্না কাটি করেছি আর আব্বার কোলে চড়ে ঘরে-বাইরে করেছি! এবং কোনরকমে ভোর হতে না হতেই নাকি আব্বাকে নিয়ে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়িয়েছি, আম্মা আসে কই! আফসোস, সেইসব অনুভূতি, আবেগ কিছুই এখন বলতে গেলে তেমন করে অনুভব করি না। সব কেমন যেন মরে গেছে; কিংবা এত ভোঁতা হয়ে গেছে টের পাওয়া যায় না! :(


৪।
আর একটা স্টীল পিকচার আমার সবসময় চোখে ভাসে। আমি তখনো স্কুলে যাই না, অনেক ছোট; বলতে গেলে কোলের শিশু। সে সময় আম্মার বদলী হলো রংপুর মিঠাপকুর এ। আম্মা গেলেন সেখানে, সঙ্গে আমার এক জ্যাঠাতো ভাইকে নিয়ে গেলেন। একা অফিস করে আমাকে সামলাতে পারবেন না, তাই। মিঠাপুকুরের কোন স্মৃতিই আমার মনে নেই, কেবল একটা ছাড়া-সেই স্টীল পিকচার! একটা লঞ্চ বা স্টীমার জাতীয় কিছু একটা চলছে, তার ডেকে আমি আর ভাইজান, আমি ওর কোলে। এবং যতদিন আমরা মিঠাপুকুরে ছিলাম বেশ অনেকদিনই এটা ঘটেছে মনে পড়ে। ও আমাকে নিয়ে নদীর এপাড় ওপাড় করত! হয়ত আমাকে শান্ত রাখার একটা উপায় ছিল এটা। বড় হয়ে এই স্মৃতি মনে পড়লে, প্রশ্ন জেগেছে-মিঠাপুকুরে এরকম নদী/বিল/সমুদ্র কোথায় আছে যেখানে লঞ্চ/স্টীমার চলে রেগুলার! কিন্তু মনের গভীরে গেঁথে যাওয়া একটা জ্বলজ্বলে স্মৃতিকে বাস্তবতার আঙ্গীকে খুঁচিয়ে অকৃতিমতার রেশটুকু নষ্ট করতে বা কমাতে ইচ্ছে করেনি কখনো। থাকলোই না হয় কিছু অস্বচ্ছতার আবরন!

Tuesday, July 19, 2011

ভুল বাস এবং একটি মজার অভিজ্ঞতা!

ভুল বাস এ উঠে পড়ার কারনে আজকে একটি মজার ঘটনার সম্মুখীন হলাম।

সকালে বাসা থেকে বের হয়েছি। পল্টন হয়ে যাবো প্রেসক্লাব মোড়। উত্তর বাড্ডা মেইন রোডে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি, প্রচন্ড ভীড়ের কারনে সুপ্রভাত/বন্ধু/ভিক্টর... এসব কোন বাসে উঠতে পারছি না। সুযোগ থাকলে সাধারণত তুরাগ এ কম উঠি। কিন্তু শেষে বাধ্য হয়ে একটা তুরাগেই কোনমতে উঠে পড়লাম; পরে ঠেলেঠুলে পিছনে গিয়ে হাফ ছেড়ে বাঁচলাম।

একটা জিনিস লক্ষ্য করেছি, লোকজন বাসের সামনের দিকে, গেটের কাছে ভীড় করে দাঁড়িয়ে থাকে অথচ পিছনে হয়ত ফাকা জায়গা থাকে, তবু পিছাবে না! অনেকদিন হয়ে গেলো এই বসুন্ধরা-বাড্ডা-রামপুরা রুটের অবস্থা দেখছি, আমার একটা অব্জারভেশন এরকম। বাসের গেটের অবস্থা দেখে যখন মনে হয় যে সুই ফেলার জায়গাও নেই ভিতরে, তখনও মোটামুটি ৯০ ভাগ নিশ্চয়তা দেয়া যায় যে; কোনমতে কষ্ট করে উঠে পড়ে গেটের কাছের ভীড়টা কাটাতে পারলেই হল, পিছনে ভালোমত দাঁড়ানোর জায়গা পাওয়া যাবে! ১০ ভাগ সম্ভাবনা থাকে যে আসলেই পুরো বাস কানায় কানায় ভরা! তবে এরকম বাস খুব কমই দেখেছি। আর সমস্যা হচ্ছে যে, ভীড়ের বাসে পিছনে ফাকা থাকলেও গেটে লোকজন এমন চাপাচাপি করে দাঁড়িয়ে থাকে যে সেখানে ঊঠতে পারা রীতিমত একটা বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

যাই হোক, তুরাগ চলছে। মালীবাগ রেলগেটে এসে সেটা যে বামে মোড় নিয়ে খিলগার দিকে ঢুকে পড়েছে তা আর খেয়াল করিনি। আসলে তুরাগ এর রুট এটাই; জানা ছিল না বা জানা থাকলেও মনে ছিল না। ভেবেছিলাম পল্টন-জিপিও হয়ে গুলিস্তান যাবে। যখন বুঝতে পারলাম ততক্ষণে খিলগা ওভারব্রীজ চলে এসেছে। কী আর...সেখানে নেমে গেলাম। কিছুক্ষন খুঁজে একটা রিকশা পেলাম, মালীবাগ পর্যন্ত ফেরার জন্যে।

রিকশায় ঊঠলে সাধারণত মুড ভালো থাকলে আমি রিকশাওয়ালাকে এটা সেটা জিজ্ঞেস করি; যেমন বাড়ি কই, ঢাকায় কতদিন, আয়-রোজগার কেমন হয়, জমা থাকে কেমন ইত্যাদি। আজকে আমার তাড়া থাকায় শুধু বলেছি তাড়াতাড়ি টানতে একটু, আমার ১১ টার মধ্যে পৌঁছাতে হবে। মাথায় চিন্তা, ১১ টার মধ্যে পৌঁছাতে না পারলে ছুটি নেয়া, কষ্ট করে ঘুম থেকে ঊঠে এরকম কাহিনী করে যাওয়া...সব কিছু বৃথা যাবে। একটু পর দেখি তিনি আমায় জিজ্ঞেস করছেন আমার বাড়ি কই, উত্তরবঙ্গ নাকি? উলটা জিজ্ঞেস করলাম আমি, কেন, আমার কথায় কি বোঝা যাচ্ছে নাকি?
-না, চেনা লাইগতেছে, আগে আপ্নাক দেখছি বলি মনে হইতেছে তো; ভদ্রলোকের উত্তর।
-আমার বাড়ি কুড়িগ্রাম, বলে তারটা কোথায় জানতে চাইলাম।
-আমার বাড়িও কুড়িগ্রাম।
-কুড়িগ্রাম কই?
-নাখারগঞ্জ ইউনিয়ন
-নাগেশ্বরীর নাখারগঞ্জ নাকি... রামখানা নাখারগঞ্জ যেটা?
-হ্যা।
-আমারো নাগেশ্বরীতেই।
-নাগেশ্বরী কই আপনার বাড়ি, তার স্বতস্ফুর্ত জিজ্ঞাসা।
-কলেজ মোড়েই।
এরপর কিছুক্ষন কথা বার্তা নাই। সে হঠাত বলে ওঠে, নাগেশ্বরীতে এক উকিলের বাসাত আপ্নাক দেখছি।
-মামলা আছে নাকি আপনার? স্বভাবিকভাবেই এবার আমি আরো আগ্রহী হয়ে উঠি এবং কথায় নাগেশ্বরীর টোনও চলে এসেছে ততক্ষণে।
-না, আমার তো মামলা না।
-তাইলে কার।
-অন্য এক লোকের মামলা, তা আমি একদিন তার সাথে গেছিল্যাম।
-ও আচ্ছা।
-(কিছুক্ষন চুপ থেকে) তা উকিলের নাম কি মনে আছে আপনার, যার বাড়িত আমাক দেখছিলেন?
-হজরত উকিল।
-আচ্ছা।
ইতোমধ্যে মালীবাগ রেলগেট চলে এসেছে। নেমে যাওয়ার আগে মুচকি হেসে ওনাকে বললাম, হজরত উকিলের ব্যাটা আমি! এইজন্যে দেখছেন। :)

আমার আশ্চর্য লাগলো এই ভেবে যে, একদিন দেখেই ভদ্রলোকের কীরকম মনে ছিলো এবং আজকে দেখে ঠিক চিনতে পারছে!! অনেকে হয়ত ভাবতে পারেন এটা আর এমন কী; একজন রিকশাওয়ালার ক্ষেত্রে এটা ঘটছে বলে আমি এত আশ্চর্য হচ্ছি নাকি! না, ব্যাপার তা না। আসলে আমার নিজের স্মরণশক্তি মোটেই ভালো না, সত্যিকার অর্থে খুবই খারাপ, ১ বারের দেখায় তো মোটেই নয়, বেশ কয়েকবার দেখেও কাউকে মনে রাখা আমার জন্যে অনেক কঠিন; রাস্তাঘাট মনে রাখার ব্যাপার তো আরো ভয়াবহ। ঢাকায় এমন অনেক রাস্তা/গলি আছে, আমি মোটামুটি অনেক বারই গেছি, বা এখনো যাই...কিন্তু এখনো একা চিনে চিনে বের হতে পারি না; রিকশাই ভরসা! যেমন, বাসার এখানে খানবাগ আর নতুন রাস্তা'র মাঝেখানের গলিগুলা আমি এখনো সামলে উঠতে পারিনি! একদিন তো গলি আউলে ফেলে পাক্কা ১ ঘন্টা চক্কর দিয়েছিলাম রাতে!

যাই হোক, এই জন্যেই আসলে বেশ অবাক হয়েছিলাম। ভালোও লেগেছে। এছাড়া এলাকার রিকশাওয়ালা। নিজে যা পারিনা, অন্য কাউকে তা পারতে দেখলে ভালো লাগে, মজাও লাগে। যেমন, আমি কীবোর্ড না দেখে টাইপ করতে পারি না, স্পিডও স্বাভাবিকভাবেই বেশি না; কিন্তু যখন কাউকে দেখি, না দেখে সাবলীলভাবে দ্রুত টাইপ করে যাচ্ছে, মাঝে মাঝে তার হাতের দিকে তাকিয়ে থেকে আঙ্গুলের খেলা দেখি, দেখতে ভালো লাগে! আর ভাবি, কীভাবে! কীভাবে সম্ভব এটা!!

Thursday, November 25, 2010

স্মৃতিতে আমি-২

[এই সিরিজটি মূলত আমার নিজেকে নিয়ে লেখা। বিভিন্ন সময়ের খন্ড খন্ড কিছু আলগা ছবি- যেগুলো হয়ত এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায় নি, কিন্তু স্মৃতির গভীরে ঝাপসা হয়ে যেতে বসেছে, মাঝে মাঝে আনন্দ/বেদনাময় দূর্বল কোন মুহুর্তে উঁকি দেয়, সেগুলো ধরে রাখার একটি অপচেষ্টা কেবল এই সিরিজ। এবং সঙ্গত কারনেই কোন প্রকার সময়ক্রম বজায় রাখা যায়নি এতে।]
------------------------------------------------------------------------



১।
ইন্টারমিডিয়েট দিয়ে ঢাকা এসে মেসে ওঠার পরে স্বাভাবিকভাবেই চৌকি, তোষক, বালিশ, ফ্যান ইত্যাদি অনেক কিছুই কিনতে হয়েছিল । যেদিন মেসে উঠলাম ওই দিনই কেনা হয়েছিল মোটামুটি বড় আর প্রধান জিনিস সব। কিনতে গিয়েছিল আব্বা আর ইসমাইল ভাই। আমরা ৩ জন- আমি, মোনতা আর শামসুদ্দোহা- তখন মেসেই ছিলাম, রেস্ট নিচ্ছিলাম বোধ হয়। বলা ভালো, গরমে সিদ্ধ্ব হচ্ছিলাম কারন পাশেই রান্নাঘর এবং আমাদের মাথার উপরে কোন ফ্যান ছিল না। যাই হোক, কিছু জিনিস কেনা হয়েছিল ব্যক্তিগতভাবে নিজ নিজ টাকায় আর কিছু জিনিস ছিল ৩ জনের মিলিতভাবে কেনা।

চৌকি কেনা হয়েছিল ২ টা। একটা সিঙ্গেল, আর একটা ডাবল। সিঙ্গেল চৌকি আর তার তোষক টার টাকা আমার দেয়া ছিল (মানে শ্রদ্ধেয় বাপজান দিয়েছিলেন)। কিন্তু পরে থাকার সময় এলে আমি আর শামসুদ্দোহা এক বিছানায় ঘুমাবো ঠিক করলাম, আর মোনতাকে দিলাম আলাদা সিঙ্গেল বিছানাটায়। ও মুটকু হওয়াতে সুবিধাটা পেল! এদিকে দোহা বাড়ি থেকে একটা ডাবল তোষক নিয়ে এসেছিল, সেটা বিছানো হল বড় চৌকিটায়। একটা ট্রাঙ্কও কিনে এনেছিল আব্বা ট্রাঙ্ক টাও মোনতাই ব্যবহার করত মূলত; আমরা কেবল টাকা পয়সা কিছু রাখতাম। পরবর্তীতে বুয়েটে চান্স পাওয়ার পরে আমাকে অনেকদিন বাসায় থাকতে হয়েছিল ক্লাস শুরুর আগের সময়টাতে। ওদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শুরু হয়ে গিয়েছিল। তাই মোনতা মেস থেকে আমার তোষক আর ট্রাঙ্ক ওর হলে নিয়ে গেল। কথা ছিল আমি হলে উঠলে পরে নিয়ে নিব। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এর পরে আমি হলে উঠছি, ওর সঙ্গে অনেকবার ট্রাঙ্ক নিয়ে কথাও হয়েছে এবং আমিও বিভিন্ন সময় কারনে অকারনে একুশে হলে ওর রুমে অনেকবারই গেছি; কিন্তু কখনই আর সেই ট্রাঙ্ক/তোষক নেয়া হয় নি! আমাদের মেসের সেই তোষক-ট্রাঙ্ক দিয়েই সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করলো; আর এদিকে আমিও আর আবার তোষক কিনি নি, রুমে যার সিটে উঠেছিলাম তার ফেলে যাওয়া তোষক দিয়েই বুয়েট লাইফ শেষ করে দিলাম!

ভাবছি, মোনতার কাছে খোজ নেয়া দরকার একদিন, আমার তোষক আর ট্রাঙ্ক এর কী অবস্থা এখন!!!! :D


২।
সানরাইজ এ ভর্তি নিয়ে একটা বিব্রতকর ব্যাপার ছিল, যেটা কখনোই ভুলতে পারি না। বিষয়টা বেশ মজারও বলা যায়। ইসমাইল ভাই যখন কোচিং এ ভর্তি করে রেখেছিলো, তখন আমার কলেজ এর নাম দিয়েছিলো রংপুর ক্যান্ট!! (সম্ভবত ও ভেবেছিল নাগেশ্বরী কলেজ তো কেউ চিনবে না, তাই পরিচিত কোন নাম দেই!)। ঢাকা আসার আগে ফোনে ভাইয়া কোচিং এ ভর্তির খবর দেয়ার সময় এটা বলেছিল, তবে তখন মজাই লেগেছিলো একরকম! :) কিন্তু পরে যে তা বেশ বিব্রতকর বিষয় হয়ে দাঁড়াবে সেটা তখন আমিও বুঝতে পারি নি, আর ভাইয়াও নিশ্চয় বুঝতে পারে নি। কোচিং এ যাওয়ার পর প্রথমবারের মত চিন্তিত হয়ে পড়লাম। প্রথম ক্লাস, বরাবরের মত এখানেও পিছনের দিকের বেঞ্চে বসেছি। পরিচয় পর্ব হচ্ছে। কলেজের নাম কী বলব এ নিয়ে বেশ দ্বিধা-দ্বন্দে ভুগছি; মাথার মধ্যে চিন্তা- ফর্মে তো ক্যান্ট লেখা, নাগেশ্বরীর নাম কীভাবে বলি, আবার নাগেশ্বরীর নাম না বলাটাও ঠিক না। কোন স্বিদ্ধান্ত নিতে না পেরে শেষ পর্যন্ত চিন্তা করলাম যেহেতু ক্যান্ট এর নাম দেয়া আছে, তাই ক্যান্ট এর নামই বলি! তখন মাথায় এটা খেলেনি যে, ফর্মে কী আছে সেটার সাথে সত্যিটা বলার আসলে কোন সম্পর্ক নেই। খুব সহজেই সত্যিটা বলা যেত, তাতে কোন ক্ষতি-বৃদ্ধি হত না এবং পরে কোচিং অফিসে গিয়েও সংশোধন করে দেয়া যেত ভুলটা। তবে নতুন পরিবেশ, নামকরা সব কলেজের স্মার্ট স্মার্ট স্টুডেন্টস- সব মিলিয়ে মনে হয় কেমন যেন একটা লজ্জা, অস্বস্তি বা হীনমন্যতা আর কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা কাজ করছিল, তাই আসল কথাটা বলা হয় নি। এবং এতে করে ব্যপারটা মোটেই ভাল হয় নি। কোচিং এ পরবর্তীতে বেশ অস্বস্তির মধ্যে যেতে হয়ে হয়েছিলো এজন্যে, যদিও এটা নিয়ে কখনো কথা হয় নি কোচিং এর কারো সাথে তবু। অস্বস্তির পুরোটা ছিল প্রধানত নিজের সঙ্গে নিজের।

কিন্তু, কেমন দেখাবে হঠাত করে বলা যে আমি ক্যান্ট এর না, আগে তাহলে কেন দেয়া হয়েছিলো-- ইতাদি নানা দ্বিধা আর অস্বস্তিতে পরে আর এই ভুলটা শোধরানো হয়নি। ক্যান্টের কয়েকজন ছিলো কোচিং এ। এদের মধ্যে একজনকে মনে আছে। বুয়েট এ ভর্তি হয়েছিলো। বুয়েটে ভর্তি হওয়ার পর বিভিন্ন সূত্রে ওর সঙ্গে পরিচয় থাকলেও, কোচিং সময়ের সেই ব্যাপার এর জন্যে বা তার নিজের ভাবের জন্যেই কি না কে জানে, পুরো বুয়েট লাইফে ওর সঙ্গে আমার সম্পর্ক কখনোই সহজ হয় নি। তবে বুয়েটে ভর্তির পর ক্লাস শুরুর পর পরেই রংপুর এর অন্যান্য কিছু ফ্রেন্ডদের সঙ্গে যখন একটা সার্কেল তৈরি হল তখন ওদেরকে ওই ঘটনা বলেছিলাম। দেখা গেলো যে এটা ওদেরও মাথায় ছিলো। সানরাইজ এর প্রস্পেক্টাসে চান্স পাওয়াদের তালিকায় ক্যান্টের একজন এর নাম/ছবি, যাকে ওরা রংপুরে জীবনেও দেখেনি!? সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেছে! :D

৩।
নিজস্ব গন্ডির বাইরে আমি তেমন একটা মিশুক ছিলাম না কখনোই। কোচিং এও তাই হাতে গোনা ২/১ জনের সঙ্গেই ভালোমত একটু পরিচয় ছিল। কথা বার্তা, মেলামেশা যা হত ওদের সঙ্গেই। এর মধ্যে আহাম্মদ একজন। ও নিয়মিত নরসিংদী থেকে আসত ৮ টার ক্লাসে, ট্রেনে করে। আমি চিন্তা করতাম রেগুলার দেড় ঘন্টা করে জার্নি করে ও কেমনে ক্লাস করে! পরবর্তীতে ভর্তি হওয়ার পর অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে আবিষ্কার করলাম ও আর আমি একি সেকশনে! প্রথম ল্যাব ছিলো ফিজিক্স; গ্রুপ করলাম একসঙ্গে- সঙ্গে সুমন। কোচিং এর ব্যাচের আর একজনের কথা মনে পড়ে; রফিক, সিভিল এ ভর্তি হয়েছিলো।

আমি আর আহাম্মদ দেশেই আছি, সুমন সুদূর আমেরিকায়। রফিক এর সঙ্গে কোন যোগাযোগ নাই।

৪।
আমাদের মেস এ পানির বেশ সমস্যা ছিলো। ড্রামে পানি ধরে রাখতে হত কারন নির্দিষ্ট সময়ে পানি দিত বাড়ির মালিক। কাপড় চোপড়ও তাই পানি আসার সময়ের সঙ্গে সিঙ্ক করে ধোয়া লাগতো। আর বালটিতে কাপড় ভিজিয়ে বালতি এনে চৌকির নিচে রাখতাম আমরা কারন বাথরুমে জায়গা ছিল কম। একবার পানি কম আসছিল বা ব্যস্ত ছিলাম- কিছু একটা হয়েছিল ঠিক মনে করতে পারি না; চৌকির নিচে বালতি রাখার পরে ভুলে গিয়েছি! তিন দিন পর সে কথা খেয়াল হয়েছে! তবে কাপড় চোপড় গুলো নষ্ট হয়নি যতদূর মনে পড়ে। :)

Wednesday, November 17, 2010

একদিন মাটির ভিতরে হবে ঘর
রে মন আমার
কেন বান্ধো দালান ঘর...

লিঙ্কঃ
http://www.4shared.com/audio/nuibYysh/Akdin_Matir_Vitore_Hobe_Ghor.html?cau2=403tNull


ক্ষণিক বিদায়ের সুর,
শুনিতে না পারো;
অনন্ত বিচ্ছেদের ধ্বনি তুমি
সহিবে কেমনে!

Thursday, November 11, 2010

স্মৃতিতে আমি-১

[এই সিরিজটি মূলত আমার নিজেকে নিয়ে লেখা। বিভিন্ন সময়ের খন্ড খন্ড কিছু আলগা ছবি- যেগুলো হয়ত এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায় নি, কিন্তু স্মৃতির গভীরে ঝাপসা হয়ে যেতে বসেছে, মাঝে মাঝে আনন্দ/বেদনাময় দূর্বল কোন মুহুর্তে উঁকি দেয়, সেগুলো ধরে রাখার একটি অপচেষ্টা কেবল এই সিরিজ। এবং সঙ্গত কারনেই কোন প্রকার সময়ক্রম বজায় রাখা যায়নি এতে।]
------------------------------------------------------------------------


২৮ অক্টোবর, ২০০০।
১০ বছর আগের এই দিনে বুয়েট এর ভর্তি পরীক্ষা হয়েছিলো আমাদের। এখনো অনেককিছু বেশ অম্লান; যেন ভাসছে চোখের সামনে।

ইন্টারমিডিয়েট দিয়ে কোচিং করার জন্য ঢাকা এসেছিলাম সে বছরই জুলাই এর ১ তারিখে। আমাদের পাশের বাসার ইসমাইল ভাই তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। উনি আগেই ফার্মেগেট সানরাইজ কোচিং এ ভর্তি করে রেখেছিলেন। মেসও ঠিক করে রেখেছিলেন। ১৩২, পুর্ব রাজাবাজার, ফার্মগেট। ঐতিহাসিক ফরিদ ভাই এর মেস! আর বাসার মালিক খোকা ভাই। আমরা তিন ফ্রেন্ড- আমি, মোনতাছির ও শামসুদ্দোহা, আর আমার আব্বা- আমরা চার জন এসেছিলাম। সেটা আমার দ্বিতীয়বার ঢাকা আসা। প্রথমবার এসেছিলাম মেট্রিক পরীক্ষা দিয়ে তাবলীগ জামাতে এক চিল্লায়। ঢাকায় (কাকরাইল মসজিদে) সেবার একদিন ছিলাম চিল্লায় যাওয়ার আগে।

১৩২ পুর্ব রাজাবাজার এর দোতলার পশ্চিমে ৬০০ স্কয়ারফিট এর ২ বেডরুমের একটি ফ্লাট; মাঝখানে একটু ডাইনিং স্পেস। তারই ভাড়া ৩x৭০০=২১০০ টাকা। সেখানেই ২ টি চৌকি ফেলে এ শুরু হয়েছিল আমাদের তিন বন্ধুর ঢাকার জীবন, কয়েক মাসের মেস জীবন। উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন; একটি তথাকথিত সুখী-সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে প্রস্তুতি!!
তারপর... প্রায় নিত্যদিনের বরাদ্দ ডিমের ঝোল এ নিরন্তর ভেসে চলা, পাশের ছাঁদে হেটে বেড়ানো কারো প্রতি মাঝে মাঝে নিষিদ্ধ উঁকি, কোচিং এর পেইনফুল ক্লাস-পরীক্ষা, তারি মাঝে হয়ত কোন ভাইয়ার ছোটভাইসুলভ স্নেহে চোখে পানি চলে আসা, রোমাঞ্চকর কিছু অনুভূতির জন্ম- স্মৃতির ভান্ডারে সব মিলিয়ে তিক্ত-মধুর নানা অভিজ্ঞতা জমতে জমতে চলে এসেছিলো ২৮ অক্টোবর। বুয়েট এর ভর্তি পরীক্ষার দিন। এর মাঝে বাড়ি যাওয়া হয়নি, যদিও অন্য ২ জন ইতিমধ্যে ঘুরে এসেছে বাড়ি থেকে।

ঠিক মনে নেই- রাত থেকেই নাকি সকাল থেকে শুরু হয়েছিলো; তবে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছিলো সেদিন। একেবারে মুষলধারে। ঘুম থেকে উঠে শেষ মুহুর্তের মত এটা সেটা কিছু জিনিস দেখে ৮ টায় বের হলাম বাসা থেকে। দোহা এল সঙ্গে নিচ পর্যন্ত, এগিয়ে দেয়ার জন্যে। মনে আছে গাণিতিক রসায়ন বইটা সঙ্গে নিয়েছিলাম তবে সঙ্গে ছাতা ছিলো কি না খেয়াল নেই। (নিলে সম্ভবত মনে থাকতো।) যাই হোক, রিকশায় উঠলাম বৃষ্টির মধ্যে। প্লাস্টিক দিয়ে ঢেকে রওনা দিলাম। পূর্ব রাজাবাজার থেকে বুয়েট, ভাড়া ২০ টাকা

পলাশীতে এসে রিকশা ছেড়ে দিতে হল জ্যামের জন্য। তারপর আস্তে আস্তে যখন বুয়েটের গেটের দিকে এগুচ্ছিলাম, একটু একটু করে কেমন জানি খারাপ লাগছিলো। রাস্তার ২ দিকে, মাঝখানে সব দিকে শুধু গাড়ি আর গাড়ি। সেগুলো থেকে একজন করে পরীক্ষার্থী/পরীক্ষার্থিনী নামছে, আর তাদের সঙ্গে নামছে আরো ২/৩ জন করে! আর আমি ছিলাম একেবারে একা; বিশাল সমুদ্রের মাঝে প্রত্যন্ত নাগেশ্বরী থেকে আসা আমার নিজেকে কেন জানি তাই খুব ক্ষুদ্র আর অসহায় লাগছিল। গাড়ি ছাড়া কেউ বা একা নিঃসঙ্গ আমার মত আরো কেউ সেখানে ছিলো নিশ্চয়ই, (আসলে বড় অংশটাই তো তারা) তবে দেখেছি বলে আজ আর মনে করতে পারি না। কিছুটা কষ্ট আর অবুঝ অভিমানে হেটে যাওয়া আমার পক্ষে তখন সেটা কিছুটা অসম্ভবও ছিল বৈকি।

বৃষ্টি তখনো চলছে। আগের দিন টেক্সটাইল এর পরীক্ষা দিয়ে ফেরার পথে দেখে গিয়েছিলাম কোথায় সিট পড়েছে। জনস্রোতে মিশে আমি তাই এগুতে থাকি সিভিল বিল্ডিং এর দিকে। সিভিল ড্রয়িং রুমে ঢুকে সিটে বসার পর খেয়াল করলাম মাথা পুরোটা ভিজে গেছে। কিন্তু পকেটে হাত দিয়ে দেখি রুমাল মেসে ফেলে এসেছি। নিজের ভুলের কারনেই কিছুটা কষ্ট আর বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন সকলের প্রতি উথলে ওঠা একটা অহেতুক অভিমানকে চাপা দিয়ে ভেজা শরীর-মাথা নিয়ে শুরু করলাম অপেক্ষা।
অনিশ্চিতের জন্য অপেক্ষা।

১০ বছর পরের কথা।
২২ অক্টোবর ২০১০, মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার দিন। ছোটবোনটা মেডিকেলে পরীক্ষা দিবে। ওকে সঙ্গে নিয়ে আমি আর মামা বগুড়া মেডিকেল কলেজে গেলাম সকালে। আব্বাও অবশ্য এসেছেন পরীক্ষা উপলক্ষে বাড়ি থেকে, কিন্তু মামার বাসাতেই ছিলেন, পরীক্ষা হলে আর যান নি। আমরা ২ জনেই ওকে নিয়ে গেছি। এটাই ওর প্রথম ভর্তি পরীক্ষা। কলেজের সামনে যখন পৌছালাম, দেখি চারিদিকে লোকে লোকারণ্য। সাজ-সাজ রব! ডাক্তার হওয়া বলে কথা!

মুন কলেজের ভিতরে ঢোকার পরে কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে ছিলাম বাইরে। (আসলে মোটর সাইকেল পাহারা দিচ্ছিলাম।) মনে পড়ে গেল ১০ বছর আগের আমার নিজের বুয়েট ভর্তি পরীক্ষার কথা; ঢাকা আসা-মেস-কোচিং-পরীক্ষা... একে একে অনেক স্মৃতিই উঁকি দিতে লাগলো। অবচেতনভাবে যেন চলে যাচ্ছিলাম সে দিনগুলোতে। আমার বুয়েট ভর্তি পরীক্ষার সেদিনের সেই দৃশ্য আর বগুড়া মেডিকেল এর সেদিনের মধ্যে বেসিক্যালী কোন তফাত নেই, কেবলমাত্র এখানে গাড়ির চেয়ে মোটরসাইকেল এর সংখ্যা বেশী তবে আমার কাছে সবচেয়ে বড় তফাত এবং ভালোলাগার বিষয় ছিলো যে, ১০ বছর আগে আমার সঙ্গে কেউ ছিলো না আর আজ মুন এর সঙ্গে আমরা ২ জন ছিলাম। সঙ্গে আব্বাও তো এসেছেন পরীক্ষা উপলক্ষে!





পরিশিষ্ট-১
ভিজে চুপচুপে হয়ে পরীক্ষা দিয়ে পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে হল থেকে যখন বেরোলাম তখন বুয়েট ক্যাম্পাসে প্রায় হাটু পানি অথচ সকালে হল এ ঢোকার সময় এত পানি ছিলো না। হাটু পানি ভেঙ্গে ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে হাটতে হাটতে মেডিকেল মোড়ে গিয়ে দাঁড়ালাম, শহীদুল্লাহ হলে যাবো। বাস/রিকশার জন্য অহেতুক ১ ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকার পর ভালোমত শুনে নিয়ে কিছুদূর হেটেই যখন শহীদুল্লাহ হল পেয়ে গেলাম, তখন নিজেকে পুরো আব্দুল মনে হচ্ছিল! মজার ব্যাপার হচ্ছে শহীদুল্লাহ হলে গিয়ে দেখি সেখানে হাটুর অনেক উপর পর্যন্ত পানি।

পরিশিষ্ট-২
আমি বুয়েট এ চান্স পেয়েছিলাম ইইই (ইলেক্ট্রিক্যাল এন্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনীয়ারিং) তে এবং ভর্তিও হয়েছিলাম। তবে ছোটবোনটা মেডিকেল এ চান্স পায় নি। :(

পরিশিষ্ট-৩
১। আমি বুয়েট ইইই থেকে পাশ করে এখন ঘোড়ার ঘাস কাটছি। প্রথমে একটি টেলিকম ভেন্ডর এ ঢুকেছিলাম যেখানে প্লানিং, রিপোর্টিং, প্রোজেক্ট ম্যানেজমেন্ট, কো-অর্ডিনেশন; লেবার, ড্রাইভার এন্ড টেকনিক্যাল টিম ম্যানেজমেন্ট এবং মাঝে মাঝে নিজেই লেবার এর কাজ করা...ইত্যাদি অনেক কিছুই করেছি। আর এখন একটি মুঠোফোন কোম্পানীতে দিন-রাত বসে বসে অ্যালার্ম দেখে জীবনীশক্তি নষ্ট করছি।
২। শামসুদ্দোহা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংলিশ এ অনার্স মাষ্টার্স করার পরে এখন একটা স্কুল এ পড়াচ্ছে। ঢাকাতেই থাকে।
৩। মোনতাছির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জুওলজী তে অনার্স মাষ্টার্স করে প্রথমে জয়পুরহাট জেলা শিক্ষা পরিদর্শক হিসেবে ও পরে একটি ব্যাংক এ কিছুদিন চাকরী করে ছেড়ে দিয়েছে কারণ ২৮তম বিসিএস এ এএসপি হিসেবে উত্তীর্ণ হয়েছে ও। এখন বাসায় বসে ট্রেনিং এর জন্য অপেক্ষা করছে



আপডেট-১ [২৫ নভেম্বর ২০১০]
দোহা বিয়ে করল গত ১৬ নভেম্বর ২০১০। অভিনন্দন দোহা!!

আপডেট-২ [২৩ জুলাই ২০১১]
দোহা এখন অগ্রণী ব্যাঙ্কে জব করে। মোনতা সারদায় পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে ১ বছর মেয়াদী ট্রেনিং করছে, সেটা অবশ্য শেষের পথে। চিন্তা করছি, ও পোষ্টিং পেলে যার যার উপর আমার রাগ আছে তাদের নামের একটা লিস্ট ধরায়ে দেব ওকে, সাইজ করার জন্য!
মেডিকেল এ চান্স না পেলেও মুনমুন পরে ডেন্টাল এ চান্স পেয়েছে। ঢাকা ডেন্টাল এ ইতোমধ্যে এক সেমিস্টার শেষ করে ফেলেছে ও।
আর আমার, কোন পরিবর্তন নেই! :)

Sunday, May 9, 2010

অনেক অনেক ভালোবাসা তোমার জন্য, মা!

সেই জন্মেরও অনেক আগে থেকেই তুমি আমায় দিয়ে যাচ্ছ, ভরিয়ে তুলেছ প্রতিনিয়ত, তোমার অকৃত্রিম স্নেহ আর ভালোবাসায় ...
আর আমি অধম? শুধু নিয়েই চলেছি। জানি তোমার ঋন কখনো শোধ হবার নয়, তবু, সেই চিন্তাও কী কখনও মাথায় এসেছে বা আসে?
মনে পড়ে না!

যখন যেখানেই থাকি না কেনো, তুমি ঠিকই খোঁজ নাও; ঠিক তোমার ফোন পেয়ে যাই- বাবা, কেমন আছ? বাসায় গেলে আমার আওয়াজ পেলেই তোমার ব্যাকুলতা দেখি- কী খবর, কেমন আছ বাবা? কিন্তু কদাচিত দু একবার ছাড়া আমি মনে করতে পারি না কখনো তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, কেমন আছ মা!

আমি জানি, বাসায় কোন বিশাল সাইজের মাছ এলে প্রায়ই কিছু টুকরো চলে যায় ডীপে, আমি কবে আসব তার অপেক্ষায়! অথচ এখানে? ক্রমাগত মাছ, মাংস, ফ্রাইড চিকেন, বিরিয়ানী কিংবা খিচুরী যাই খাই না কেনো, একবারের জন্যেও মনে পড়ে না তুমি আজ কী খেলে, কেমন খেলে!

ফেক ব্যাস্ততায় তোমার জন্য আলাদা করে দুটো মিনিট বের করার সময় হয় না আমার। অথচ অফিস, বাড়ির নানান সব ব্যস্ততার মাঝেও আমাদের কথা তোমার এক মুহুর্তের জন্যেও বিস্মরণ হয় না!

আসলে তুমি তো মা!
মায়েরা এমনিই! পাওয়ার হিসেব কী তারা করেন, দেয়াতেই তাদের সন্তুষ্টি; অপার আনন্দ!
তাই তো তোমরা মহিমান্বিত!

ভালো থেকো মা, অনেক ভালো।
তোমার জন্য, সকল মায়ের জন্য, ভালোবাসা, অনেক অনেক ভালোবাসা।

Wednesday, May 5, 2010

বাড্ডা থেকে ঠাটারী স্টার ভায়া জিয়া উদ্যান-মোস্তাকিম!

[ডিসক্লেইমারঃ ইহা একটি অত্যন্ত দীর্ঘ লেখা, আপনার বিরক্তি উদ্রেক করতে পারে অধিকন্তু ইহা নিতান্তই ব্যক্তিগত এবং নির্দিষ্ট গুষ্টীয় লেখা সুতরাং পড়লে নিজ দায়িত্বে পড়ার অনুরোধ করছি পড়ে মেজাজ খারাপ হলে কোনভাবেই আমাকে অভিযুক্ত করা যাবে না]


গতকাল নাইট এর পরের দিন হিসেবে অফ ছিলো।
তাই সকালে অফিস থেকে এসে আচ্ছামত একটা ঘুম দিয়েছি। ঘুম ভেঙ্গেছে বিকেল প্রায় সাড়ে পাঁচটায়। এতক্ষন ঘুমালাম! একটু আশ্চর্য হয়ে স্বভাববশত মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখি সেটা বন্ধ হয়ে আছে! যাক মোবাইল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঘুমটা চরম হয়েছে! :D

চার্জে দিয়ে মোবাইল অন করে বেশ কিছু এমসিএ পেলাম। রনি, আশীষ দা, রাকিবা, এহসান ভাই, মমিন ভাই, মোনতা ও রাজিব এর কল ছিলো! (বিখ্যাত হয়ে গেলাম নাকি! :S)। একে একে ব্যাক করা শুরু করলাম। তখন আবার দাদা'র ফোন। কথা হচ্ছে, রাকিবা বাড্ডা ও আমার এখানে আসতে চায় দাদা'র বাসা খূঁজতে কারণ বাসা খুঁজতে এলে নাকি আমি খাওয়াই। কারণ আগের দিন দাদা আসছিলো, ওরে হেভী খাওয়া দিছিলাম! এই ফাকে বলে নেই দাদাকে বর্তমান বাসা থেকে তাড়ায়ে দিচ্ছে; কেনো কে জানে! :) তো আমি বললাম ওয়েল্কাম, আসুক। কিন্তু একটু পরেই আবার দাদা বলে যে রাকিবা পল্লবীতে ডাকতেছে, ওর অফিসে। খাইছে! বাড্ডা থেকে পল্লবী, খবর আছে! একটু দ্বিধার পরেও রাজী হয়ে গেলাম। দাদা অফিস থেকে এসে গুলসান-১ এ অপেক্ষা করবে; আমি বাসা থেকে ১ নাম্বার এ যাবো। প্রায় আধ ঘন্টা পর আবার দাদার ফোন। সে অপেক্ষা করতেছে ১ নাম্বার এ, আমার কোন খবর নাই! এদিকে আমি তখন খেতে বসেছি মাত্র। এখানে বলে রাখি উপরোক্ত কথাগুলো যখন হচ্ছিলো তখন আমি মাত্র ঘুম থেকে উঠেছি, খাইনি এবং গোসলও করি নি। সুতরাং আমার একটু সময় লাগবে স্বাভাবিক। :| তখন ওরে আমার এখানে চলে আসতে বললাম; এখান থেকে যাওয়া যাবে। ফোন রেখে ভাবলাম, এবার একটু আরাম আয়েশ করে নড়া চড়া করা যায়, দাদা তো এখানে আসতেছেই! :)

একটু পরে দাদা আসলো। তার কিছুক্ষন পরে ও বলে, চলেন মোহাম্মদপুর যাই। আমি তো আরো রাজী; মোহাম্মদপুর আরো কাছে প্লাস মোহাম্মদপুর এর বিখ্যাত চাপও খাওয়া যেতে পারে। অনেকদিনের লোভ! :) যাকগে, আমি রেডী হচ্ছি এই ফাকে আশীষ রাকিবার সাথে কথা বলে মাঝখানে জিয়া উদ্যান কে মিটিং প্লেস হিসেবে ঠিক করলো কারণ ও পল্লবী থেকে আসবে।

আমরা বের হলাম।
সিএনজি নিয়ে রওনা দিলাম। যেতে যেতে হবি, সুকান্তি, পিযুষ, মনিকে ফোন দেয়া হলো। এদের মধ্যে মনি ফোন ধরলোও না, ব্যাকও করলো না। আশীষ বলল ওর নাকি মিটিং ছিলো। যাহোক, পৌছালাম জিয়া উদ্যান এর সামনের রাস্তায়। সংসদ ভবনের ঠিক পিছনেই যে হাফ ওয়ালটা তাতে বসলাম। আহ, যা বাতাস! কী ঠান্ডা পরিবেশ! কিন্তু একটু পরে একটা বেরসিক পুলিস এসে তুলে দিলো! :( এখানে নাকি বসা যায় না!
কী আর, রাস্তার উলটা পাশে গিয়ে বসলাম। পাশে একটা জুটি। অল্প কিছুক্ষন পরেই তারা উঠে গেলো! আমি ভাবলাম আমাদের কারনে বিরক্ত হলো নাকি! আশিষ দার অবশ্য ভিন্ন মত; পোলাপান এখন এত ভাল না যে আমাদের দেখে উঠে যাবে। :)

১০ টাকার ১০০ গ্রাম বাদাম কিনে নিয়ে খেতে খেতে শুরু করলাম অন্যদের জন্য অপেক্ষা। প্রথমে আসলো হবি। তার একটু পর সুকান্তি আর পিযুষ। ইতোমধ্যে অমিতাভকে বরাবরের মতই ফোনে তেল মারা হচ্ছিল আসতে রাজী করানোর জন্যে। প্রায় ২০ মিনিট ধরে তেল দিয়ে ওরে আসতে রাজী করা গেলো। ততক্ষনে রাকিবাও চলে এসেছে। গল্প গুজবে রাত প্রায় ৯.৩০ বেজে গেছে। আমি সারাদিন বলতে গেলে না খাওয়া! :( এম্নিতেই মোহাম্মদপুরের চাপ আমাকে ডাকতেছিলো, তার উপর হবি আবার স্টার এর ফালুদা খাওয়ার কথা বলছিলো!! সো, ওখানে বসে কি আর বাদাম চিবানো যায়! :)

হাটা শুরু করলাম মোস্তাকিম এর উদ্দেশ্যে। মোহাম্মদপুরবাসীদের মত, মোস্তাকিম এরই চাপ নাকি বিখ্যাত! মেইন রোড থেকে রিকশা নিয়ে পৌছালাম মোস্তাকিম এ। একটু পরে অমিতাভ এসে উপস্থিত। রিকশা থেকে নেমেই তার সে কি ঝাড়ি আর ফাপর! কিন্তু পাত্তা দেয় কে! টাইম আছে! :)

গিয়ে বসলাম ভিতরে। অর্ডার দেয়া হলো চাপ এর, সঙ্গে লুচি। পোলাপান যা খাচ্ছিলো! আমি এই প্রথম খাচ্ছি ওখানে; ভালোই লাগছিলো। ৭ জনে মিলে খেলাম ৯ টা চাপ [৫ টা খাসী, ৪ টা গরু] আর ১২২ টা লুচি!! খেয়ে বের হয়ে সামনের দোকান থেকে কয়েকটা স্পেশাল পান প্যাকেট করে নিলাম, কারণ এবার ফালুদা! ফালুদার আগে তো আর পান খাওয়া যায় না! :)

রাত বাজে প্রায় সাড়ে দশটা। অমিতাভ বলে, চলেন ঠাটারীবাজার স্টার। আমি বললাম ধানমন্ডি স্টার এ একটা ঢু দেই। আশিষ দা বলে এত রাতে ধানমন্ডি স্টার এ কিছু পাওয়া যাবে না। আল-মাহবুব আর কী যেন একটা আছে পাশে। রাকিবা বলল ওখানেও এত রাতে পাওয়া যাবে না। এদিক দিয়ে অমিতাভ আবার ভাত খাবে স্টার এ, হবি খাবে ফালুদা, সঙ্গে আবার সে অমিতাভ কে বিট করতে চায় বলে সেও ভাত খাবে; আর আমি তো আছিই যে, ফালুদা খাবোই আজকে। অগত্যা আর তো কোন উপায় নেই; ঠাটারীবাজার স্টারই সই!
কিন্তু রাকিবা আর সুকান্তি যাবে না। আর পিযুষ বলতেছিলো ভাই, আমারে বেশী জোর করিস না! আর যায় কই! সুকান্তি আর রাকিবা চলে গেল। আমরা বাকি ৫ জন হাটা দিলাম স্টার এর উদ্দেশ্যে!

এদিকে আবার আর একটা ঘটনা আছে বলে নেই। মোস্তাকিম এ ১ লিটার সেভেনআপ দিয়েছিলো একটা। ওইটা যখন শেষ তখন কোক/পেপসি চাইলাম আমরা। কিন্তু তারা কোক/পেপসি না পেয়ে আরসি নিয়ে আসলো। নিলাম না, আজকে কোক-ই খাবো! দরকার হলে এখান থেকে বের হয়ে বাইরেই খাবো। সেজন্যে যে ওয়ানটাইম গ্লাসগুলো দিয়েছিলো আমাদেরকে পানি/ড্রিঙ্কস খেতে তার কয়েকটা নিয়ে নিলাম পরে কোক খাওয়ার জন্যে। হে হে। হাটতে হাটতে সামনে এক দোকানে কোক পেলাম। এক্সপায়ার ডেট দেখতেছিলাম আমি, Jun3110, কিন্তু বলতেছিলাম ডেট তো পার হয়ে গেছে, আমার মাথায় কাজ করছিলো যে জ়ুন তো ছিলো গত মাসটা! দোকানী বোঝানোর চেষ্টা করছিলো যে পার হয় নাই কিন্তু আমি পুরা কনফিডেন্ট; বোতল রেখে দিয়েছি অলরেডী! এইসময় অমিতাভ না কে জানি এসে ডেট দেখে বলে যে, ঠিকি তো আছে! তারপরে আমার মাথায় খেলল যে আসলেই তো, আমিই ভুল করতেছিলাম! :( যাই হোক নিলাম। যারা গ্লাস নিয়ে আসছিলো, আমি বাদে অন্যদেরটা অলরেডী ভেঙ্গে ফেলেছে। সো, আমি গ্লাস এ ঢেলে নিয়ে আরাম করে খাওয়া শুরু করলাম! :D

যাই হোক, হাটতে হাটতে একটা ক্যাব পেলাম। কিন্তু সঙ্গে দুই দুইটা হাতি, এক ক্যাবে ওঠা এতই কী সহজ! আশীষ আর হবি সামনে বসলো, পিছনে আমি আর ২ হাতি! কিন্তু ড্রাইভার সাহেব সামনে ২ জন নিবেন না, তার নাকি গিয়ার দিতে সমস্যা হবে! অগত্যা সামনে বড় হাতি (আমিতাভ) কে দিয়ে পিছনে আমরা বাকি ৪ জন কোনরকমে বসে চললাম ঠাটারীবাজার।

স্টার এ ঢুকে আমরা (আমি আর অমিতাভ আগে ছিলাম) কাচঘেরা জায়গাটাতে হাত পা ছড়ায়ে বসছি মাত্র। কিন্তু বিধি বাম! এখান থেকেও তুলে দিল। এই অংশ নাকি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। :(

বাইরে এসে বসে আমিতাভ আর হবি অর্ডার দিলো সাদা ভাত, সবজি, মুর্গীর মাসল্লাম আর তাওয়া ফ্রাই না কি জানি; আর আশীষ দা ফালুদা। ওদের ভাত খাওয়া দেখে আমারো একটু ইচ্ছে ইচ্ছে করছিলো, তার উপর গরম ভাত কিনা! হে হে। তাই অমিতাভ এর অল্প একটু পামেই নির্দ্বিধায় হাত ধুতে গেলাম। এসে দেখি সবাই হাসতেছে! কাহিনী কী- পিযুষও কনভিন্সড! হা হা হা। আমি আর পিযুষ একটু ভাত খেলাম। খাওয়া দাওয়া নিয়ে কথার এক পর্যায়ে অমিতাভ বলে বসলো, 'আরে খান মিঠু ভাই, কী আর এমন বয়স হইছে আপনার!' পরিবেশ টা এমনি ছিলো যে হাসতে হাসতে আমাদের অবস্থা খারাপ! এভাবে পুরা খাওয়ার সময় কয়েক দফা হাসাহাসি হলো এটা নিয়ে। :) অমিতাভ বলছিলো আমার ওয়াল এ লিখে দিবে! বেচারা হেভী মজা পাইছে! এভাবে গল্পগুজবের মধ্যে দিয়ে কিছুটা চোখের ক্ষুদা, আর কিছুটা অমিতাভ এর পাম- সবমিলায়ে খাবোনা খাবোনা করেও বেশ ভালই খেলাম। কারণ খাওয়ার পরে দেখি পেটে কোন জায়গা নেই! তারপরেও ফালুদা বলে কথা! দিলাম অর্ডার আমাদের ৪ টা। খাওয়ার সময় দেখা গেলো ওদের ৩ জনের টা শেষ, আমারটা তখনো অর্ধেক বাকি! হবির অবশ্য বদ্ধমূল ধারনা ছিলো আমি শেষ করতে পারব না। কিন্তু ওদেরকে কাচকলা দেখিয়ে শেষ করলাম শেষ পর্যন্ত! টেবিল থেকে উঠে তো আর হাটতে পারি না; পুরা লোডেড! অনেক কষ্টে অমিতাভ আর পিযুষ এর ঘাড়ে মাঝে মাঝে হাত রেখে হাটা দিলাম মেইন রোড এর দিকে; আর মুখে দিলাম এতক্ষন ধরে যত্ন করে রাখা পান। [পানটা রাখার কৃতিত্ব হবির।] রাত তখন প্রায় সোয়া বারোটা।

যাই হোক, একটা সিএনজি নিয়ে আমি রওনা দিলাম গুলিস্তান থেকে বাসার দিকে। আর ওরা রিকশা খুঁজতে গেলো। আমি বাসা পৌছে ওদেরকে এসএমস দিলাম, 'আমি পৌছাইছি, তোমাদের কী খবর'। রিপ্লাই পেলাম, ওরা সব তখনো রাস্তায়! রিকশা পেতে নাকি দেরী হয়েছিলো। অমিতাভকে ফোন দিয়ে হেভী একটা ভিলেনী হাসি দিলাম যে আমি গুলিস্তান থেকে বাড্ডা চলে আসলাম আর তোমরা এখনো রাস্তায়! এই হাসি শুইনা অমিতাভ বলে যে 'আপনারে অভিশাপ দিতাছি, আপনার কালকে পেট খারাপ করবে, খবর হয়ে যাবে ...'। শকুনের দোয়ায় গরু মরে না যখন বললাম তখন বলে, তাহলে গ্যাসট্রিক এর প্রব্লেম হবে, এসিডিটি হবে ইত্যাদি ইত্যাদি।' হা হা হা।

যাকগে, একটু ফ্রেশ হয়ে এসে ল্যাপ্পি তে যখন বসলাম রাত তখন ১ টা পার। কিছুক্ষন পর দেখি ফেসবুক নোটিফিকেশন মেইল...অমিতাভ আমার ওয়াল এ কিছু একটা লিখেছে! :)
পরে রাত তিনটার দিকে দেখি গ্যাস ফর্ম করছে হাল্কা। আমার আবার গলব্লাডার নাই কিনা! :) সাবধান হয়ে গেলাম। অমিতাভ এর কথা যেন আবার সত্য না হয়ে যায়, তাই আর আজকে দুপুর পর্যন্ত কিছু খেলাম না, শুধু ১২ টার দিকে এক কাপ র চা। এর পরে ৩ টায় সামান্য একটু ভাত। দিব্ব্যি সুস্থ আছি! অমিতাভ, তুই বেটা মর গিয়া!
:D :D হা হা হা।

এলেবেলে-২

ইন্ট্রোভার্ট আগে থেকেই ছিলাম। বুয়েট এ ভর্তির আগে সেটা খুব একটা বোঝা যায় নি কারণ তখন আমরা বন্ধু-বান্ধবরা ছিলাম হাতে গোনা কয়েকজন মাত্র যাদের বেশীরভাগই আমরা একসঙ্গে সেই ছোটবেলা থেকে পড়েছি। আমাদের চলা ফেরা ছিলো প্রধানত নিজেদের এলাকাতেই, উঠাবসা ছিলো পরিচিত পাড়া-প্রতিবেশী আর লোকজনদের নিয়ে নির্দিষ্ট একটা গন্ডিতে।
কিন্তু বুয়েট এ ভর্তির পর সম্পুর্ন নতুন একটা গন্ডিতে, বিভিন্ন এলাকার নতুন নতুন অনেক মুখ এর ভীড়ে এসে প্রথম বুঝতে পারি আমি আসলে কতটা ইন্ট্রোভার্ট!

এই অবস্থা থেকে আজ যততুকু অগ্রগতি হয়েছে তার অনেকটা কৃতিত্ব কিছু নির্দিষ্ট লোকের, নির্দিষ্ট একটা গুষ্টির; যাদের আমি খুবই পছন্দ করি। :D
সামান্য কিছু সময় গুটি কয়েক বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে, কিছুটা সময় ক্লাস এ আর বাকি পুরোটা সময় রুমে শুয়ে বসে ঘুমিয়ে আর বাপকে ভুজুং ভাজুং দিয়ে কিনে নেয়া কম্পুতে গুতিয়ে কেটে যাচ্ছিলো বুয়েট লাইফ! এরি মাঝে একদিন সেই গুষ্টির সঙ্গে পরিচয়, শুরু এক নতুন পথচলার... :)

যা হোক, একটা সময় ছিলো যখন ইন্ট্রোভার্ট থাকলেও আমার নামে কারো তেমন কোনো অভিযোগ ছিলো না; বরং উলটো আমি অন্যদের নামে অভিযোগ করতে পারতাম। এক একজন এক এক জায়গায় থাকলেও বেশ রেগুলার একটা যোগাযোগ ছিলো স্কুল কলেজের ঘনিষ্ট বন্ধু-বান্ধব সবার সঙ্গেই। কিন্তু অনেকদিন থেকেই সেই অবস্থাটা আর নেই। এখন আমি আর কাউকে সেভাবে ফোন করি না, খোজ খবর নেই না, কারো বাসায়/মেসে/হোস্টেলে যাই না। বুয়েট এর এবং বাইরের ব্যক্তিগত পরিচিতদেরও কারো কারো একি মত আমার ব্যাপারে।
এক তরফাভাবে যোগাযোগ রাখতে রাখতে সম্ভবত ক্লান্ত হয়ে পরিচিত লোকজন আর বন্ধুবান্ধব দের কেউ কেউ এখন আর আমাকে ফোন করে না; আবার কারো কারো অভিযোগ আমি ফোন ধরি না বা কেটে দিয়েও ব্যাক করি না...!

অভিযোগগুলো সত্যি। আসলে দিন দিন লাইফ কেমন রোবোটিক হয়ে যাচ্ছে বা হয়ত হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। অফিসে বেশীরভাগ সময়েই থাকি ব্যস্ত; বাসায় এসে কিছুটা ক্লান্ত। স্বপ্রনদিত হয়ে তেমন কিছু করা হয়ে ওঠে না। এমনিতেই আমার ভুলে যাওয়া রোগ আছে আগে থেকে। বেশীরভাগ সময়ই জিনিসপত্র ভুলে যাই। অবস্থা মনে হয় এখন আরো খারাপ। শুধুই ভুলে যাই। এমনও হয় মাঝে মাঝে যে, কেউ ফোন করে কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজের কথা বলেছে অথচ ফোন রাখার পরেই তা দিব্বি ভুলে গেছি! আবার ফোন করে তার হয়ত আমাকে মনে করিয়ে দেয়া লেগেছে।
এ অবস্থা এক দুই দিন বা এক দুই মাসের নয়, অনেকদিন ধরেই এই অবস্থা। যতই দিন যাচ্ছে ততই সেই নির্দিষ্ট একঘেয়ে ট্র্যাকের মধ্যে সেধিয়ে যাচ্ছি। নাক জাগানোরও চেষ্টা নেই। এবং এইটাই ভয়ের কথা। প্রায়ই ভাবি, আর না, এবার একটু গা ঝাড়া দেই; শীত নিদ্রা থেকে জেগে উঠি, কিছু কাজ কর্ম করি; কতদিন মাইমুন/যহুরুল/মুহি/...এদের সাথে কথা হয় না, আড্ডা দেয়া হয় না- একটা ফোন করি। কোনোটাই হয় না। আবার আমি সময় করে ওঠার আগেই হয়ত অন্যরা সময় করে ওঠে, মাঝখান থেকে অভিযোগ-অনুযোগ আর অভিমানের পাল্লাটাই ভারী হয় শুধু।

কতদিন মুহি'র বাসায় যেতে চাইছি; যাওয়া হয় না। কতদিন থেকে ঢাকায় নাগেশ্বরী'র ফ্রেন্ড্রদের জন্য একটা গেট-টুগেদার আয়োজন করতে বলে আসছে পোলাপান, আমিও চাচ্ছি, কিন্তু করা হচ্ছে না; যাষ্ট করা হচ্ছে না। ঠিক জানি না কেন। এ কি কেবলই ব্যস্ততা নাকি স্রেফ অলসতা; কে জানে!

সবাইকে দেখি বাড়ি যাওয়ার জন্যে কী উদ্গ্রীব থাকে; ২/৩ দিনের ছুটি পেলেই দেয় বাড়ি দৌড়! আমি সেরকম কোন টান অনুভব করি না :(
জীবনে প্রথম বার বাড়ি ছেড়েছিলাম ৪০ দিনের জন্যে এসএসসি'র পরে এরপরে এইসএসসি দিয়ে কোচিং করতে দ্বিতীয়বারের মত ঢাকা এসে একটানা সাড়ে চার মাস ছিলাম, একেবারে এডমিশন টেষ্ট এর রেজাল্ট পর্যন্ত! অথচ এর মাঝে আমার বাকি ২ ফ্রেন্ড ২ বার করে ঘুরে গেছে বাড়ি থেকে!
ইদানিং এমন হচ্ছে বাসায়ও ঠিকমত ফোন করা হয়ে ওঠে না। অথচ আব্বা/আম্মা/ছোট ভাই-বোন ঠিক-ই নিয়ম করে রেগুলার ফোন দেয়। আমি অধম এখানেও ভুলে যাই। আমি এমনকি ভুলে যাই ছোট ভাই-বোন দুটোর জন্মদিন! এক আধ বার না, প্রায় প্রতি বছরই! এবারো যথারীতি ভুলে গিয়েছিলাম! ব্যাপারগুলো কি আসলে কেবলই ভুলে যাওয়া? না মনে হয়। এটা একরকম দায়ীত্বজ্ঞানহীনতা আর উদাসীনতার নামান্তর। আমি জানি; জেনেও কোনো কিছু করতে পারছি না। আর এই উদাসীনতা শুধু এই একখানে নয়, সবক্ষেত্রেই আমার একি অবস্থা। একদিন আম্মা তো আক্ষেপ করে সম্ভবত আব্বাকে বলছে শুনলাম, ও তো এখন বড় হয়েছে, আমাদের কথা কী আর শোনার দরকার আছে! ওরে ওর ইচ্ছে মত চলতে দাও, চলুক!... :(
নিজের উপর বিরক্তি ধরে যাচ্ছে, কাউকেই সন্তুষ্ট করতে পারছি না।

আবেগ অনুভূতিগুলো আগে থেকেই ভোঁতা; এমনিতেই অন্যদের থেকে বুদ্ধি-বিবেচনায় স্লো, সবকিছুই যথেষ্ট দেরিতে বুঝি বা কখনো হয়ত বুঝিই না; তদুপরি বোধশূন্য অসাড় হয়ে যাচ্ছি দিনকে দিন
হয়ে যাচ্ছি বিরক্তিকর, অসামাজিক আর অস্পৃশ্য; পরিচিতজন আর ফ্রেন্ডদের কাছে, বাবা-মার কাছে, আত্মীয়স্বজন-পাড়াপ্রতিবেশীদের কাছে।
:(