সূত্রঃ প্রসঙ্গ ঈদ পূনর্মিলনী '০৫ ম্যাগাজিন/ ব্যাচ '৯৮, নাগেশ্বরীঃ আমি যা লিখেছিলাম
ক্যাটাগরীঃ বুক ভরা বেদনা
______________________________________
পলাশের সঙ্গে কিভাবে পরিচয় হয়েছিল তা আজ আর ভালভাবে খেয়াল নেই। সাধন স্যারকে চিনতাম (মাইমুন ছোটবেলা থেকেই তার কাছে পড়ত) , সাধন স্যারের ভাগনে হিসেবে ক্লাস নাইনে আর্টস এ ভর্তি হওয়া পলাশের সঙ্গে প্রথম পরিচয় সম্ভবত আতা'র মাধ্যমে। সাইন্স এবং আর্টস এর সমান্তরাল গতিতে এরপর পলাশের সঙ্গে ঘনিষ্টতা থাকলেও খুব বেশী ঘনিষ্টতা হওয়ার সুযোগ হয় নি। আমাদের সংগঠন ("আমরা "), ব্যাচের পূনর্মিলনী, ম্যাগাজিন ইত্যাদি নিয়ে যেবার আমি রংপুরে সাত দিন থাকলাম তখনই পলাশের সঙ্গে গড়ে ওঠে বেশ ঘনিষ্ট এবং হৃদ্যতার সম্পর্ক। একান্তভাবে মেশার সুযোগ হয় ওর সঙ্গে। ও ছিল খুবই বন্ধুবৎসল। আমি থাকতাম আতা’র ওখানে, ওসমানীতে আর গেস্ট মিল চলত বলে খাওয়া দাওয়া করতাম পলাশের ওখানে। আমার যেতে দেরি হলে পলাশ প্রায়ই না খেয়ে অপেক্ষা করত একসঙ্গে খাওয়ার জন্য। খাওয়ার পর আমি গান শুনতাম আর ও হিসেব নিয়ে বসত, তখন ও ছিল ডাইনিং এর ম্যানেজার। অথচ --
কে. বি. হোস্টেলের ওর সেই ৪ নং রুম, সেই ডাইনিং - সবকিছূ আজ তেমনি আছে - শুধু পলাশ নেই। কঠিন এক অসুখে আক্রান্ত হয়ে সে চলে গেছে আজ আমাদের থেকে অনেক অ-নে-ক দূরে। বহুদিন আগে অসুস্থ হলেও মাদ্রাজে চিকিৎসার পর এবং নিয়মিত সেখানে গিয়ে চেকআপ করিয়ে ও বেশ সুস্থই ছিল। কিন্তু সেই সুস্থতার যে এত তাড়াতাড়ি চিরাবসান ঘটবে আমরা কল্পনাও করতে পারি নি। হঠাৎ করে একদিন বেশ অসুস্থ হওয়ায় সে যখন আবার মাদ্রাজ গেল, তখন আমরা ঘুনাক্ষরেও ভাবতে পারিনি যে এই যাওয়াই হবে তার জীবনের শেষ যাওয়া। ২৩ আগস্ট ’০৪, সোমবার শেষ বারের মত দেশে ফেরার পর দিবাগত রাত ৩:২৪ মিনিটে সে চলে গেল আমাদেরকে নিঃস্ব করে।
যখন শুনলাম "পলাশ নেই" - মেনে নিতে প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল বিধাতা যেন অবিচার করছেন! এখনও যখন পলাশের কাছ থেকে শেখা পদ্ধতিতে চোখ বন্ধ করে গান শোনার চেষ্টা করি, চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে পাই পলাশের সেই হাসিমুখ- গান শুনতে শুনতে যেন একটু একটু মাথা ঝুঁকছে , বিশ্বাস হয় না যে পলাশ নেই! তন্ময় হয়ে ভাবি, এবার হাতে সময় আছে- রংপুর হয়ে ঘুরে বাড়ি যাব। পরক্ষণে বাস্তবে ফিরে যখন দেখি, শত পরিচিত-অপরিচিত মুখের ভিড়ে সেই চেনা মুখটিকে আর খূঁজে পাব না, বুকের গভীর থেকে হু হু করে উঠে আসে অব্যক্ত কান্না, চোখ ভিজে ওঠে জলে, রংপুর আর যেতে ইচ্ছে করে না।
সংগঠন, পূনর্মিলনী, ম্যাগাজিন এসব নিয়ে পলাশের খুব আগ্রহ আর উচ্ছ্বাস ছিল। আজ ম্যাগাজিন বের হল, পূনর্মিলনীও হল গতবার, এবারও হচ্ছে কিন্তু এক বুক বেদনা আর অতৃপ্তি এই যে, আমাদের মাঝে পলাশের থাকার কথা ছিল, অথচ সেই মহামিলন আমাদেরকে করতে হল পলাশকে ছাড়া, দূঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে।
বন্ধু, তোমাকে অন্তিম মুহূর্তে একটি বারের মত শেষ দেখা দেখতে আমরা অনেকেই আসতে পারি নি। এই অধম বন্ধুদেরকে তুমি তাই পারলে ক্ষমা করো। আদিগন্ত বিস্তৃত নীল আকাশের যেখানেই তুমি থাকো না কেন বন্ধু, সহস্র হৃদয়ের বুক ভরা ভালোবাসা আর শুভ কামনা রইল তোমার জন্য। আমাদের হৃদয়ে থাকবে তুমি চিরকাল, সারাজীবন, রাতের আকাশের উজ্জল নক্ষত্র হয়ে।
বিদায় বন্ধু।
0 comments:
Post a Comment