স্বাগতম


Thursday, March 4, 2010

স্বেচ্ছায় রক্তদান ও বিভিন্ন সংগঠন

সূত্রঃ প্রসঙ্গ ঈদ পূনর্মিলনী '০৫ ম্যাগাজিন/ ব্যাচ '৯৮, নাগেশ্বরীঃ আমি যা লিখেছিলাম

ক্যাটাগরীঃ ফিচার

______________________________________





চিত্র-১
রাত ১টা ঢাকা শহরের কোন নামী দামী হাসপাতাল অপারেশন থিয়েটারের (ও.টি.) সামনে পায়চারী করছেন ১০ বছরের শিশু ‘আকাশ’ এর বাবা-মা ব্ল­াড ক্যান্‌সার এ আক্রান্ত আকাশ ও.টি. তে হঠাৎ হন্ত দন্ত হয়ে ডাক্তার বেরিয়ে এলেন ও.টি. থেকে জরুরী ভিত্তিতে রক্ত লাগবে রক্তের গ্রুপ এবি- (AB-)| হাসপাতালের ব্ল­াড ব্যাংকে ঐ গ্রুপ নেই তাছাড়া, ফ্রেশ ব্ল­াড লাগবে ডাক্তার বললেন একজন ডোনার (রক্তদাতা) ম্যানেজ করতে উপস্থিত তাদের কারও গ্রুপ মিলল না রক্ত পাওয়া না গেলে হয়ত বাঁচানো যাবে না তাদের প্রানপ্রিয় সন্তানকে বিশ্ব চরাচর যখন গভীর ঘুমে নিমগ্ন, তখন তারা ছুটলেন রক্তের সন্ধানে, একজন ডোনারের খোঁজে

চিত্র-২
আসগর সাহেবের মা অসুস্থ ডেঙ্গু মারাত্মক পর্যায়ে ডাক্তার বলেছেন মা'কে বাঁচাতে হলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ব্যাগ প্লাটিলেট (রক্তের একটি উপাদান) অর্থাৎ ব্যাগ রক্ত (Whole blood) লাগবে তিনি নাওয়া খাওয়া ভুলে দৌড়াচ্ছেন রক্তের সন্ধানে একটাই চিন্তা, মা'কে তিনি বাঁচাতে পারবেন তো ?


উপরোক্ত দুটি চিত্রই আমাদের দৈনন্দিন জীবনের খুবই স্বাভাবিক দুটি ঘটনা রক্ত মানুষের শরীরের এমন একটি মূল্যবান উপাদান যার বিকল্প আজ একবিংশ শতাব্দিতে বিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতি সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয় নি রক্তের বিকল্প শুধু রক্তই যা টাকার পরিমাপে মূল্যায়ন অসম্ভব এক ব্যাগ রক্তের অভাবে ঝরে যায় হাজারো প্রাণ তাই রক্তের প্রয়োজন মানেই ঝুঁকিপূর্ন জীবন আর অধিকাংশ মুমূর্ষের জন্য রক্তের প্রয়োজন কিন্তু সামাজিকভাবে পশ্চাৎপদ বাংলাদেশে স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের সংখ্যা নিতান্তই অপ্রতুল তাই রক্তের অভাবে প্রতি বছর মারা যাচ্ছে একটি বিশাল জনগোষ্ঠী যা একজন বিবেকবান মানুষের বিবেককে নাড়া দেবার জন্য যথেষ্ট আমাদের কি কিছুই করার নেই ?


হ্যা, আছে! আমরা যারা সক্ষম, তারা নিয়মিত রক্তদানের মাধ্যমে এই হারকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে পারি সেই মহৎ উদ্দেশ্যে স্বেচ্ছায় রক্তদানকে উৎসাহিত করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে বেশ কিছু সংগঠন যার ফলশ্রুতিতে রক্তের অভাবে মৃত্যুর হার আজ অনেক কমে গেছে সন্ধানী, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন, বাঁধন, রেড ক্রিসেন্ট এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে


এদের মধ্যে বাঁধন ছাড়া অন্যান্য সংগঠনগুলোর কাজ করার ধারা/মূলনীতি একই রকম তারা বিভিন্ন জায়গায় ক্যাম্প (Blood Donation Camp) করে, সংগৃহীত রক্ত ফ্রিজে সংরক্ষণ করে এবং সেখান থেকে রোগীদেরকে সরবরাহ করে বাঁধন কাজ করে বিভিন্ন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় এর হলগুলোতে বাঁধন কর্মীরা জেনে রাখে হলের ছাত্র/ছাত্রীদের (ডোনার) কার রক্তের গ্রুপ কী এবং রক্ত দেয়ার ক্ষেত্রে কার মানসিকতা কেমন যারা রক্ত দিতে চায় না বা ভয় পায় বাঁধনকর্মীরা তাদেরকে রক্ত দিতে নিয়মিত উৎসাহ প্রদান উদ্বুদ্ধ করে থাকে যখন কেউ রক্তের জন্য আসে, তখন বাঁধনকর্মীরা ডোনারদেরকে তাৎক্ষনিকভাবে নিয়ে গিয়ে রক্ত দিয়ে আসে এতে করে ফ্রেশ ব্লাড এর চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রে বাঁধন বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারছে তাছাড়া, ইদানিং ডাক্তাররা যে কোন রোগে অধিক উপকারের স্বার্থে ফ্রেশ ব্লাডের উপর গুরুত্ব বাড়াচ্ছেন এরকম ক্ষেত্রে অন্য সংগঠনগুলো, ফ্রিজের রক্ত হওয়ায় সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারছে না এছাড়া যখন ফ্রিজে জমাকৃত কোন গ্রুপের রক্ত শেষ হয়ে যায় তখন তাদের সরাসরি কিছু করার থাকে না এরকম ক্ষেত্রে অনেক সময় তারা তাদের ক্যাম্পের রেগুলার ডোনারদের সঙ্গে এবং ব্যাংকে এসে যারা রক্ত দিয়ে যায় তাদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে রক্ত ম্যানেজ করার চেষ্টা করে


সন্ধানী/কোয়ান্টাম/রেড ক্রিসেন্ট এর ব্লাড ব্যাংকে যদি আপনি নিজে এক ব্যাগ রক্ত দেন, তাহলে তারা আপনাকে যে কার্ড দেবে তা দেখালে পরবর্তীতে আপনার প্রয়োজনে তারা আপনাকে এক ব্যাগ রক্ত ফ্রি দেবে, যদি তাদের স্টোরেজে থাকে, না থাকলে ম্যানেজ করে দেয়ার চেষ্টা করবে আর এমনিতে তাদের কাছ থেকে ব্লাড নিতে হলে একটা নির্দিষ্ট চার্জ দিতে হবে যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকে স্ক্রিনিং টেস্ট ব্যাগের দাম এদিকে বাঁধন এর এরকম কোন কার্ডের ব্যবস্থা নেই যা শুধুমাত্র ফ্রি এক ব্যাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ বাঁধনকর্মীদের আছে কমিটমেন্ট (Commitment), আছে দায়বদ্ধতা- নিজের প্রতি, সমাজের প্রতি, দেশের প্রতি, দেশের সাধারণ মানুষের প্রতি যে কারণে, অসংখ্য মুমুর্ষূ ব্যাক্তিকে বাঁধনকর্মীরা প্রতিনিয়ত রক্ত দিয়ে যাচ্ছে কোনরূপ আর্থিক লাভ শর্ত ছাড়াই।


বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় লক্ষ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় আমরা পাচ্ছি খুবই সামান্য আর রক্ত চাহিদার প্রায় ৬০ ভাগই পুরণ হচ্ছে পেশাদার রক্তদাতাদের কাছ থেকে কিন্তু এই পেশাদার রক্তদাতাদের রক্তগ্রহন যে কোন রোগীর জন্যই অত্যন্ত বিপজ্জনক পেশাদার রক্তদাতারা গ্রহণ করে বিভিন্ন প্রকার মাদকদ্রব্য এবং শরীরে বহন করে সিফিলিস, গনোরিয়া, হেপাটাইটিস-বি ও এইড্সের মতো জীবন ধ্বংসকারী রোগের জীবানু তাছাড়া পেশাদার রক্তদাতাদের শরীরে হিমোগ্লোবিনের পরিমান খুবই কম কিন্তু আমাদের চাহিদা পূরণে আমরা বাধ্য হচ্ছি পেশাদার রক্তদাতাদের রক্ত গ্রহণ করতে যা কারো জীবনকে ঠেলে দিচ্ছে হুমকির মুখে।


সুতরাং - স্বেচ্ছায় রক্তদানের মাধ্যমে আপনি, আমি আমরা কি পারি না মানুষকে উপরোক্ত জীবন ধ্বংসকারী রোগজীবানু থেকে রক্ষা করতে? আমরা কি পারি না পেশাদার রক্তদাতাদের মত অশুভ শক্তিকে প্রতিরোধ করতে? আমরা কি পারি না এক ব্যাগ রক্তদানের মাধ্যমে একটি জীবনকে বাঁচাতে ?




-----------------------------------------------------------------

রক্তদানের খুঁটি-নাটি

রক্তদানের যোগ্যতাঃ
  • বয়সঃ ১৮-৫৭ বছর বয়সী প্রতিটি নারী পুরুষ।
  • ওজনঃ পুরুষ - কমপক্ষে ৪৮ কেজি / মহিলা - কমপক্ষে ৪৫ কেজি
  • রক্তচাপঃ স্বাভাবিক
  • রক্তে হিমোগ্লোবিনঃ স্বাভাবিক মাত্রা
  • সময়ঃ প্রতি চার মস (১২০ দিন) পর পর
  • শর্তঃ কোন জটিল ও মারাত্মক রোগ থাকতে পারবে না।


রক্তদানের সুবিধাঃ

  • রক্তদান করার সাথে সাথে আমাদের শরীরের মধ্যে অবস্থিত 'বোন ম্যারো' নতুন কনিকা তৈরির জন্য উদ্দিপ্ত হয়। দুই সপ্তাহের নধ্যে নতুন রক্ত কনিকা জন্ম হয়ে এ ঘাটতি পূরণ করে। প্রতি চার মাস অন্তর রক্ত দিলে লোহিত রক্তকনিকার প্রাণবন্ততা বেড়ে যায়। -ফলশ্রুতিতে দৈহিক উদ্যোম ও কাজে কর্মে স্পৃহা বাড়ে।
  • দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যায়
  • নিয়মিত রক্তদানে হৃদরোগ ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুকি কমে বলে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন
  • স্বেচ্ছায় রক্তদানে মানসিক প্রশানিত (Mental Satisfaction) আসে
  • রক্তদানের সময় স্ক্রীনিং এর মাধ্যমে আপনি জানতে পারবেন আপনার শরীর রক্তবাহিত মারাত্মক রোগ যেমন হেপাটাইটিস-বি (HsBAg), হেপাটাইটিস-সি (HCV), এইডস (HIV), ম্যালেরিয়া (MP), সিফিলিস (VDRL) ইত্যাদির জীবানু বহন করছে কি না
  • সর্বোপরি রক্তদানের মাধ্যমে গড়ে উঠবে আত্মার বাঁধন


তথ্যকনিকাঃ

  • একজন মানুষের শরীরে রক্তের পরিমান ৫-৬ লিটার
  • একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় এক ব্যাগ রক্তের পরিমান প্রায় ৪০০ মিলিলিটার আর শিশুদের জন্য তা ১০০-২০০ মিলিলিটার
  • রক্তদানের কারনে শরীরের কোন ক্ষতি হয় না বরং রক্ত উৎপন্ন হয় এমন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সমূহ ভালো থাকে
  • শরীর থেকে বের করার পর ৬ ঘন্টা পর্যন্ত ঐ রক্তকে ফ্রেশ ব্লাড বলে
  • ওপেন হার্ট সার্জারী, বাই পাস সার্জারী এসব অপারেশনে; ডেঙ্গু, থ্যালাসেমিয়া, ব্লাড ক্যানসার সহ আরও কিছু ক্ষেত্রে ফ্রেশ ব্লাড লাগে

টিপসঃ

  • রক্তদানের সময় মাথা ও শরীর সমান্তরাল রাখতে হবে
  • দূর থেকে রক্ত দিতে এলে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে হবে
  • রক্ত দেয়ার আগে ইচ্ছে করলে বিশুদ্ধ পানি পান করতে পারেন তবে রক্ত দেয়ার পরে অবশ্যই প্রচুর পরিমানে পানি সহ যে কোন তরল খাবার গ্রহণ করতে হবে
  • মনে রাখবেন, রক্তদানের আধা ঘন্টা আগে বা পরে শক্ত খাবার গ্রহণ করা উচিত নয়
  • রক্ত দেয়ার পর সঙ্গে সঙ্গেই বিছানা থেকে উঠবেন না, কমপক্ষে ৫ মিনিট শুয়ে থাকবেন [রক্তের প্রবাহ সমগ্র শরীরে স্বাভাবিক করার জন্য এটি অত্যন্ত প্রয়োজন]

------------------------------------------------------------------




প্রিয় পাঠক/পাঠিকা, একবার ভেবে দেখুন, আপনার দেয়া এক ব্যাগ রক্ত ফিরিয়ে দিতে পারে একজন মুমূর্ষ রোগীর জীবন, ফিরিয়ে দিতে পারে প্রিয়জনের মুখের হাসি তাই, আসুন আমরা সবাই মানবিক চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হই আপনি নিজে নিয়মিত রক্ত দিন, অন্যকে রক্তদানে উৎসাহিত করুন, রক্তদানকে একটি সামাজিক আন্দোলন হিসেবে গড়ে তুলুন - যাতে রক্তের অভাবে মারা না যায় আর কোন মা, বাবা, ভাই বা কোন বোন

0 comments: