ইন্ট্রোভার্ট আগে থেকেই ছিলাম। বুয়েট এ ভর্তির আগে সেটা খুব একটা বোঝা যায় নি কারণ তখন আমরা বন্ধু-বান্ধবরা ছিলাম হাতে গোনা কয়েকজন মাত্র যাদের বেশীরভাগই আমরা একসঙ্গে সেই ছোটবেলা থেকে পড়েছি। আমাদের চলা ফেরা ছিলো প্রধানত নিজেদের এলাকাতেই, উঠাবসা ছিলো পরিচিত পাড়া-প্রতিবেশী আর লোকজনদের নিয়ে নির্দিষ্ট একটা গন্ডিতে।
কিন্তু বুয়েট এ ভর্তির পর সম্পুর্ন নতুন একটা গন্ডিতে, বিভিন্ন এলাকার নতুন নতুন অনেক মুখ এর ভীড়ে এসে প্রথম বুঝতে পারি আমি আসলে কতটা ইন্ট্রোভার্ট!
এই অবস্থা থেকে আজ যততুকু অগ্রগতি হয়েছে তার অনেকটা কৃতিত্ব কিছু নির্দিষ্ট লোকের, নির্দিষ্ট একটা গুষ্টির; যাদের আমি খুবই পছন্দ করি। :D
সামান্য কিছু সময় গুটি কয়েক বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে, কিছুটা সময় ক্লাস এ আর বাকি পুরোটা সময় রুমে শুয়ে বসে ঘুমিয়ে আর বাপকে ভুজুং ভাজুং দিয়ে কিনে নেয়া কম্পুতে গুতিয়ে কেটে যাচ্ছিলো বুয়েট লাইফ! এরি মাঝে একদিন সেই গুষ্টির সঙ্গে পরিচয়, শুরু এক নতুন পথচলার... :)
যা হোক, একটা সময় ছিলো যখন ইন্ট্রোভার্ট থাকলেও আমার নামে কারো তেমন কোনো অভিযোগ ছিলো না; বরং উলটো আমি অন্যদের নামে অভিযোগ করতে পারতাম। এক একজন এক এক জায়গায় থাকলেও বেশ রেগুলার একটা যোগাযোগ ছিলো স্কুল কলেজের ঘনিষ্ট বন্ধু-বান্ধব সবার সঙ্গেই। কিন্তু অনেকদিন থেকেই সেই অবস্থাটা আর নেই। এখন আমি আর কাউকে সেভাবে ফোন করি না, খোজ খবর নেই না, কারো বাসায়/মেসে/হোস্টেলে যাই না। বুয়েট এর এবং বাইরের ব্যক্তিগত পরিচিতদেরও কারো কারো একি মত আমার ব্যাপারে।
এক তরফাভাবে যোগাযোগ রাখতে রাখতে সম্ভবত ক্লান্ত হয়ে পরিচিত লোকজন আর বন্ধুবান্ধব দের কেউ কেউ এখন আর আমাকে ফোন করে না; আবার কারো কারো অভিযোগ আমি ফোন ধরি না বা কেটে দিয়েও ব্যাক করি না...!
অভিযোগগুলো সত্যি। আসলে দিন দিন লাইফ কেমন রোবোটিক হয়ে যাচ্ছে। বা হয়ত হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। অফিসে বেশীরভাগ সময়েই থাকি ব্যস্ত; বাসায় এসে কিছুটা ক্লান্ত। স্বপ্রনদিত হয়ে তেমন কিছু করা হয়ে ওঠে না। এমনিতেই আমার ভুলে যাওয়া রোগ আছে আগে থেকে। বেশীরভাগ সময়ই জিনিসপত্র ভুলে যাই। অবস্থা মনে হয় এখন আরো খারাপ। শুধুই ভুলে যাই। এমনও হয় মাঝে মাঝে যে, কেউ ফোন করে কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজের কথা বলেছে অথচ ফোন রাখার পরেই তা দিব্বি ভুলে গেছি! আবার ফোন করে তার হয়ত আমাকে মনে করিয়ে দেয়া লেগেছে।
এ অবস্থা এক দুই দিন বা এক দুই মাসের নয়, অনেকদিন ধরেই এই অবস্থা। যতই দিন যাচ্ছে ততই সেই নির্দিষ্ট একঘেয়ে ট্র্যাকের মধ্যে সেধিয়ে যাচ্ছি। নাক জাগানোরও চেষ্টা নেই। এবং এইটাই ভয়ের কথা। প্রায়ই ভাবি, আর না, এবার একটু গা ঝাড়া দেই; শীত নিদ্রা থেকে জেগে উঠি, কিছু কাজ কর্ম করি; কতদিন মাইমুন/যহুরুল/মুহি/...এদের সাথে কথা হয় না, আড্ডা দেয়া হয় না- একটা ফোন করি। কোনোটাই হয় না। আবার আমি সময় করে ওঠার আগেই হয়ত অন্যরা সময় করে ওঠে, মাঝখান থেকে অভিযোগ-অনুযোগ আর অভিমানের পাল্লাটাই ভারী হয় শুধু।
কতদিন মুহি'র বাসায় যেতে চাইছি; যাওয়া হয় না। কতদিন থেকে ঢাকায় নাগেশ্বরী'র ফ্রেন্ড্রদের জন্য একটা গেট-টুগেদার আয়োজন করতে বলে আসছে পোলাপান, আমিও চাচ্ছি, কিন্তু করা হচ্ছে না; যাষ্ট করা হচ্ছে না। ঠিক জানি না কেন। এ কি কেবলই ব্যস্ততা নাকি স্রেফ অলসতা; কে জানে!
সবাইকে দেখি বাড়ি যাওয়ার জন্যে কী উদ্গ্রীব থাকে; ২/৩ দিনের ছুটি পেলেই দেয় বাড়ি দৌড়! আমি সেরকম কোন টান অনুভব করি না। :(
জীবনে প্রথম বার বাড়ি ছেড়েছিলাম ৪০ দিনের জন্যে এসএসসি'র পরে। এরপরে এইসএসসি দিয়ে কোচিং করতে দ্বিতীয়বারের মত ঢাকা এসে একটানা সাড়ে চার মাস ছিলাম, একেবারে এডমিশন টেষ্ট এর রেজাল্ট পর্যন্ত! অথচ এর মাঝে আমার বাকি ২ ফ্রেন্ড ২ বার করে ঘুরে গেছে বাড়ি থেকে!
ইদানিং এমন হচ্ছে বাসায়ও ঠিকমত ফোন করা হয়ে ওঠে না। অথচ আব্বা/আম্মা/ছোট ভাই-বোন ঠিক-ই নিয়ম করে রেগুলার ফোন দেয়। আমি অধম এখানেও ভুলে যাই। আমি এমনকি ভুলে যাই ছোট ভাই-বোন দুটোর জন্মদিন! এক আধ বার না, প্রায় প্রতি বছরই! এবারো যথারীতি ভুলে গিয়েছিলাম! ব্যাপারগুলো কি আসলে কেবলই ভুলে যাওয়া? না মনে হয়। এটা একরকম দায়ীত্বজ্ঞানহীনতা আর উদাসীনতার নামান্তর। আমি জানি; জেনেও কোনো কিছু করতে পারছি না। আর এই উদাসীনতা শুধু এই একখানে নয়, সবক্ষেত্রেই আমার একি অবস্থা। একদিন আম্মা তো আক্ষেপ করে সম্ভবত আব্বাকে বলছে শুনলাম, ও তো এখন বড় হয়েছে, আমাদের কথা কী আর শোনার দরকার আছে! ওরে ওর ইচ্ছে মত চলতে দাও, চলুক!... :(
নিজের উপর বিরক্তি ধরে যাচ্ছে, কাউকেই সন্তুষ্ট করতে পারছি না।
আবেগ অনুভূতিগুলো আগে থেকেই ভোঁতা; এমনিতেই অন্যদের থেকে বুদ্ধি-বিবেচনায় স্লো, সবকিছুই যথেষ্ট দেরিতে বুঝি বা কখনো হয়ত বুঝিই না; তদুপরি বোধশূন্য অসাড় হয়ে যাচ্ছি দিনকে দিন।
হয়ে যাচ্ছি বিরক্তিকর, অসামাজিক আর অস্পৃশ্য; পরিচিতজন আর ফ্রেন্ডদের কাছে, বাবা-মার কাছে, আত্মীয়স্বজন-পাড়াপ্রতিবেশীদের কাছে।
:(
1 comments:
এত ইন্ট্রোভার্ট-ইন্ট্রোভার্ট করেন কেলা??
Post a Comment